বছরের ৬ মাসই বন্ধ থাকে সুপ্রিম কোর্ট

জাতীয় লিড নিউজ

সারা দেশের আদালতে গত জানুয়ারি পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা ছিল ৩৩ লাখ ৯ হাজার ৭৮৯টি। পুরনো মামলাগুলো ঝুলছে বছরের পর বছর। তার সঙ্গে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন মামলা। বেড়ে চলেছে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তিও। অথচ মামলার নিষ্পত্তিকারী সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম কোর্টই বন্ধ থাকছে বছরের অর্ধেক সময়।

আদালত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মামলাজট বাড়ার প্রধানতম কারণ বিচারক সংকট। এর পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে।

চলতি বছরের ১৬ জানুযারি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের ‍জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘দেশে উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালত মিলিয়ে সর্বমোট ৩৩ লাখ ৯ হাজার ৭৮৯ টি মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এসব মামলার মধ্যে ২৮ লাখ ১৬ হাজার মামলা নিম্ন আদালতে, চার লাখ ৭৬ হাজার মামলা হাইকোর্ট বিভাগে এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১৬ হাজার ৫৬৫ মামলা ঝুলে আছে।’

সুপ্রিম কোর্টের ২০১৮ সালের ক্যালেন্ডারের (দিন পঞ্জিকা) দিকে তাকালে দেখা যায়, বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৮১ দিন ছুটি থাকবে। আর ১৮৪ দিন খোলা থাকবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

১৮১ দিন (৩০ দিন করে ধরলে ছয় মাসের বেশি) আদালত সরকারি, সুপ্রিম কোর্ট ঘোষিত ও অবকাশকালীন ছুটিতে থাকবে। এর মধ্যে সরকারি ছুটি থাকবে ১৭ দিন। সরকারঘোষিত শুক্র ও শনিবারের ছুটি থাকবে ১১৩ দিন। অবকাশকালীন ছুটি থাকবে ৫১ দিন।

জানুয়ারি মাসে ছুটি ছিল ৯ দিন। সুপ্রিম কোর্ট ঘোষিত ছুটি ছিল এক দিন। সরকার ঘোষিত শুক্র ও শনিবারের ছুটি ছিল আট দিন।

ফেব্রুয়ারি মাসে ৯ দিন ছুটিতে ছিল সুপ্রিম কোর্ট। এর মধ্যে সরকারি ছুটি এক দিন। সরকারঘোষিত শুক্র ও শনিবারের ছুটি ছিল আট দিন।

মার্চে ছুটি ছিল ১১ দিন। সরকারি ছুটি এক দিন। শুক্র ও শনিবারের ছুটি ছিল ১০ দিন।

এপ্রিল মাসের মোট ছুটি ২০ দিন, সরকারঘোষিত ছুটি এক দিন। শুক্র ও শনিবারের ছুটি আট দিন। এ মাসে ১১ দিন অবকাশকালীন ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অবকাশকালীন ছুটির সময় হাইকোর্ট বিভাগের কয়েকটি বেঞ্চে বিচারপতিরা বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মামলা পরিচালনা করছেন। আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি বসেন এ সময়। তবে পুরো সপ্তাহজুড়ে নয়।

অবকাশকালীন সময়ে আদালত কোনো মামলার রায় ঘোষণা করেন না। আদালত এ সময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর শুনানি করেন। এ ছাড়া জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি, বিভিন্ন মামলার শুনানি স্থগিতকরণ, কিছু কিছু মামলার আসামিদের জামিন দিতে দেখা যায়।

মে মাসের মোট ছুটি থাকবে ২৫ দিন। এর মধ্যে সরকারি ছুটি দুদিন। বাকি ১৩ দিন অবকাশকালীন ছুটি। শুক্র ও শনিবারের ছুটি থাকবে ১০ দিন।

জুলাই মাসের আট দিন ছুটির মধ্যে সব ছুটি শুক্র ও শনিবারের। এ মাসে সুপ্রিম কোর্টঘোষিত কোনো ছুটি নেই। অবকাশকালীন ছুটিও নেই।

আগস্ট মাসের ছুটি ২১ দিন। এর মধ্যে সরকারি ছুটি থাকবে চার দিন। অবকাশকালীন ছুটি আট দিন। শুক্র ও শনিবারের ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ দিন।

পুরো সেপ্টেম্বর মাসই সুপ্রিম কোর্ট ছুটিতে থাকবে। এর মধ্যে সরকারি ছুটি এক দিন। শুক্র ও শনিবারের ৯ দিন। অবকাশকালীন ছুটি থাকবে ২০ দিন।

অক্টোবর মাসে মোট ছুটি থাকবে আট দিন। এসব ছুটি শুধু শুক্র ও শনিবারের জন্য রাখা হয়েছে।

নভেম্বর মাসে ছুটি থাকবে ১০ দিন। এর মধ্যে সরকারি ছুটি থাকবে এক দিন। বাকি ৯ দিন থাকবে শুক্র ও শনিবারের ছুটি।

ডিসেম্বর মাসে মোট ছুটি থাকবে ১৯ দিন। এর মধ্যে সরকারি ছুটি দুদিন। অবকাশকালীন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে আট দিন। শুক্র ও শনিবারের ছুটি থাকবে ৯ দিন। এ মাসের ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট দিবস পালন করা হবে।

গত বছরও সর্বোচ্চ আদালত বন্ধ ছিল ছয় মাসের বেশি। অবকাশকালীন ও সরকারি ছুটিসহ সব মিলিয়ে ২০১৫ সালে ১৮০ দিন, ২০১৬ সালে ১৮৬ দিন ও ২০১৭ সালে ১৭৪ দিন  সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ ছিল। তবে শুধু অবকাশকালীন ছুটির দিনগুলোতে দুই ঘণ্টার জন্য মামলা পরিচালনা করতে আদালতে বসেন বিচারপতিরা। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সব আদালতের বিচারপতিরা বসেন না। অল্প কয়েকজন বিচারপতিকে মামলা পরিচালনা করতে দেখা যায়।

সুপ্রিম কোর্টের ক্যালেন্ডারে (দিন পঞ্জিকায়) বলা হয়েছে, নীল চিহ্নিত দিনগুলো বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগ রুলসের অর্ডার-২, রুল-৩ এবং হাইকোর্ট বিভাগ রুলসের ৩ অধ্যায়ের-রুল ২ মোতাবেক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি।

ক্যালেন্ডারে লাল চিহ্নিত দিনগুলো সরকার ঘোষিত সাপ্তাহিক ছুটি, লাল তারকা চিহ্নিতগুলো সরকারি ছুটি হিসেবে বোঝানো হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বরকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট দিবস উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যালেন্ডারে আরও বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের দেওয়ানি আদালতগুলো ২ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর বন্ধ থাকবে।

এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের অবকাশকালীন (ভ্যাকেশন) ছুটির মেয়াদ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবীরা। তারা বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবকাশকালীন ছুটি (ভ্যাকেশন) মামলাজট বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তবে হাইকোর্টের সাবেক একজন বিচারপতির মতে, ভ্যাকেশন না থাকলে বিচারপতিরা রায় লেখা ও গবেষণাকাজে সময় পাবেন না।

সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ (হাইকোর্ট বিভাগ) রুলস-১৯৭৩। হাইকোর্ট রুলসের তৃতীয় অধ্যায়ে দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্ট কোথায় বসবে, কতদিন অবকাশকালীন ছুটি থাকবে, সেটি প্রধান বিচারপতি নির্ধারণ করবেন। এ রুলসের তৃতীয় অধ্যায়ের (১) এবং সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকিবে। তবে, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লইয়া প্রধান বিচারপতি সময়ে সময়ে অন্য যে স্থান বা স্থানসমূহ নির্ধারণ করিবেন, সেই স্থান বা স্থানসমূহে হাইকোর্ট বিভাগের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হইতে পারিবে।’

হাইকোর্ট রুলসের তৃতীয় অধ্যায়ের (২)-এ অবকাশকালীন ছুটির বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘সুপ্রিম কোর্টে অবকাশকালীন ছুটি পালন করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের অবকাশকালীন ছুটি নির্ধারণ করবেন প্রধান বিচারপতি। অবকাশকালীন ছুটির বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের বাৎসরিক ক্যালেন্ডার (দিনপঞ্জিকায়) প্রচারিত হইবে।’

আইনজীবী ও বিচারপতিদের ভাষ্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবিএম নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি (ভ্যাকেশন) কমানো উচিত। এ জন্য তিনি হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেছিলেন এক দশক আগে। তিনি বলেন, ‘বছরে প্রায় চার মাস সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক কাজ বন্ধ থাকলে মামলাজট বাড়বে, বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হবে।’ মামলাজট বাড়ার পেছনের কারণ হিসেবে তিনি (ভ্যাকেশন) অবকাশকালীন ছুটির বিষয়টি তুলে ধরেন।

নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাজট বাড়াতে দীর্ঘ অবকাশকালীন ছুটির পাশাপাশি আইনের দুর্বলতা, বিচারকদের দুর্বলতা, দক্ষ স্টাফদের অভাব, মামলা শুনানিতে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আদালতে আইনজীবীদের বক্তব্য দেওয়া অন্যতম। খুব দ্রুত এসব সমস্যা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অবকাশকালীন ছুটি কমিয়ে আনার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা করেছিলাম এক দশক আগে। সে মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট অবকাশকালীন ছুটি ছয় মাস থেকে কমিয়ে চার মাস করেছে।’

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক এক বিচারপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিচারপতিদের অবকাশকালীন ছুটির প্রয়োজন আছে, কারণ তাদেরকে অনেক মামলার রায় লিখতে হয়। রায়ের সংশোধন করতে হয়। তারা তো বিশ্বের অন্য দেশের বিচারপতিদের মতো মামলার রায় লিখতে এতো সময় পান না। সিঙ্গাপুরের হাইকোর্টে ২০১৬ সালে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র আটটি। আর আমাদের দেশে বছরে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা অনেক বেশি।’

এজন্য তিনি মনে করেন দেশের আদালত বাড়ানোর পাশাপাশি বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে বেশি করে, যাতে করে মামলা জট কমে যায়।

সাবেক এই বিচারপতি আরও বলেন, ‘নিশ্চিয় আমাদের দেশে মামলা জট বেড়ে গেছে। এগুলো কমানো দরকার। তার মানে এই না যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবকাশকালীন ছুটি কমাতে হবে। বরং বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে মামলা জট কমানোর পাশাপাশি সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানো উচিত বলে আমি মনে করি।’

এই ব্যাপারে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী শেখ আকতার উল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশে দিন দিন মামলাজট বেড়েই চলছে। রাষ্ট্রপতির উচিত বিচারক নিয়োগ দেওয়া।’

শেখ আকতার উল ইসলাম বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অবকাশকালীন ছুটি কমাতে এবং দেশের বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ বসাতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার উদ্যোগ সময়োপযোগী ছিল।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি অবশ্যই কমানো দরকার। দেশের অন্যান্য অফিসের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক কাজ করলে মামলাজট কমবে। তাড়াতাড়ি মামলা নিষ্পত্তি হবে। অবকাশকালীন ছুটির মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে মাত্র কয়েকটি আদালতে বিচারপতিরা বসেন মামলা শুনানি করতে। এ সময় মামলা করে শুনানি করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে আইনজীবীদের জন্য। ভ্যাকেশনে দুই ঘণ্টার জন্য আদালতে বিচার কাজ পরিচালনা করতে বসেন বিচারপতিরা। এ অল্প সময়ে মধ্যে আইনজীবী খুব বেশি মামলা শুনানি করতে পারেন না।’

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে মানুষ বাড়ছে, মামলার পরিমাণ বাড়ছে। একজন মানুষ হাকিম (ম্যাজিস্ট্রেট) আদালত থেকে অনেক সময় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত আসে। আগে দেশে মানুষ কম ছিল, মামলাও তুলনামূলকভাবে কম হতো। তারা বিকল্পভাবে মামলা নিষ্পত্তি করে নিত। কিন্তু এখন মানুষের মধ্যে মামলা করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এজন্য সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি কমিয়ে আনা উচিত।’

২০১৭-১৮ সেশনে বারের সহ-সম্পাদক থাকা অবস্থায় শফিকুল ইসলামসহ অন্যান্য আইনজীবী নেতারা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাত করতে যান। সে সময় প্রধান বিচারপতি ছিলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। বিচারপতি সিনহার কাছে অবকাশকালীন ছুটি কমানোর প্রস্তাব তুলে ধরেন তারা।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা উদ্যোগ নিয়েছিলেন অবকাশকালী ছুটি কমানোর, কিন্তু হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা অবকাশকালীন ছুটির বিপক্ষে ছিল। যার কারণে বিচারপতি সিনহা তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেননি।’

আপনার মন্তব্য লিখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *